বি.দ্রঃদৈনিক নতুন ভাবনাপত্রিকায় প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার সম্পূর্ন লেখকের/প্রতিনিধির।আমরা লেখক প্রতিনিধির চিন্তা ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।প্রকাশিত লেখার সাথে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল সবসময় নাও থাকতে পারে।তাই যে কোনো লেখার জন্য অত্র পত্রিকার কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।

তাজা খবর

মাতৃভাষা বাংলা’র প্রথম লড়াই ১৮৩৫ সালে হলেও নেই ইতিহাসে! 

সোহেল সানিঃ-
মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাঙালির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসটা যেখান থেকে শুরু বা শেষ বলা হচ্ছে, আসলে তা কতটা সঠিক, নাকি বিকৃত ও খন্ডিত?
এমনকি ১৯৪৮ সালের ভাষা সংগ্রাম বা ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন নিয়েও  রয়েছে বিতর্ক-বিভ্রান্তি। বাঙালির ভাষা সংগ্রামকে পাকিস্তানের আমল অর্থাৎ ১৯৪৮ -‘৫২ এর মধ্যে সীমিতকরণের একটি  ব্যাপার রয়েছে। বিদেশী মনীষীরা হয়তো এ জন্যই মৃদু-ঠাট্টাস্বরে বলে ‘বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি।’ বাঙালিদের এই বদনাম আজো পরিপুষ্ট। আসল সত্য বা মিথ্যা থেকে আমরা বাঙালীরা বহুদূরে অবস্থান করছি।
১৮৮৫ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর
বৃটেন পার্লামেন্ট আইন পাস করে
রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেয় ভারত সাম্রাজ্যের শাসনভার। বিদায় ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। সেদিনের ‘ক্ষমতা হস্তান্তর পত্রটি’ ছিলো ইংরেজি ও বাংলা হরফে। হিন্দি বা উর্দুর স্থান ছিলোনা। ১৮৫৮ সালের ৫ নভেম্বর ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় ঢাকার আন্টাঘর ময়দানে। বিদ্রোহীদের গাছে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় যেখানে। পরে সেখানে বসেই ক্ষমতা গ্রহণ করেন রানী ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়া পার্ক স্বাধীনতার পর হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।
ইংরেজ আমলেও মাতৃভাষার জন্য বাঙালিদের লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে। শহীদ সালাম,রফিক,বরকত, জব্বারের সঙ্গে সেই ইতিহাসের যোগসূত্র ঘটলে ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হতো।
১৮৩৫ সালে মাতৃভাষা বাংলার সংগ্রামের সূত্রপাত। কলকাতা হিন্দু কলেজ ছাত্র উদয়চাঁদ সর্বপ্রথম মাতৃভাষা বাংলাকে জাতীয় বা সরকারি ভাষারূপে গ্রহণের দাবি করেন এক প্রবন্ধে। একদল ছাত্র সভামিছিলও করে।
কলকাতা কলেজের শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজীও। ইংরেজ হয়েও বাঙালি ছাত্রদের দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করতেন। বিদ্রোহের চেতনা জাগিয়ে তুলতেন। তাঁর অনুগামীরাই “ইয়ং বেঙ্গল” নামে সংগঠনের আত্নপ্রকাশ ঘটায়।
উদয় চাঁদের পাশাপাশি একই সময়ে আরেক বাঙালি ছাত্র কৈলাসচন্দ্র দত্ত বাংলায় একটি প্রবন্ধ লিখে ছাত্রদের মাঝে চেতনার মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। শতবর্ষ পরে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন সশস্ত্র গণবিদ্রোহের মুখে পড়বে এবং বিতাড়িত হবে বলে  ভবিষ্যত বানী করেছিলেন তিনি।
ডিরোজিও ইংরেজী ভাষায় এমন দেশাত্মবোধক কবিতা রচনা করেন, যা ছড়িয়ে দিতে বঙ্গানুবাদ করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়দাদা তিনি।
“বেঙ্গল স্পেক্টেটর” নামের দ্বিভাষিক মুখপত্র প্রকাশের আগেই “ইয়ং বেঙ্গল”গোষ্ঠী এ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে “বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি।” কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরাই অ্যালান  অক্টাভিয়াম হিউমের পরিকল্পনায় সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলো। বাঙালি উমেশচন্দ্র ব্যানার্জিকে সভাপতি করে।
ভারতবর্ষে শিক্ষা প্রর্বতনের জনক মেকলে নিজেই খোলামেলাভাবে স্বীকার করেন, ভারতে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার দরজা খোলার নেপথ্যে তাঁদের একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল- পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুরাগী এক শিক্ষিত ভারতীয় ভদ্রবেশী সমাজ গড়ে তোলা, যারা বিপুল দরিদ্র দেশবাসীর জীবন থেকে থাকবে বিচ্ছিন্ন ও থাকবে ইংরেজ শাসনের অনুগত। কিন্তু হয় তার উল্টোটা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ “শহরবাসী একদল মানুষ সেই সুযোগে শিক্ষার পেলে, মান পেলে, অর্থ পেলে তারাই এনলাইটেন্টড আলোকিত। সেই আলোর পেছনে বাকী দেশটাতে লাগলো পূর্ণগ্রহণ। স্কুলের বেঞ্চিতে বসে যাঁরা ইংরেজী পড়া মুখস্থ করলেন, শিক্ষাদীপ্ত দৃষ্টির অন্ধতায় তাঁরা দেশ বলতে বুঝলেন শিক্ষিত সমাজকে। সেইদিন থেকে জলকষ্ট বলো, পথকষ্ট বলো, রোগ বলো, অজ্ঞানতা বলো, জমে উঠলো নিরানন্দ, নিরালোক, গ্রামে গ্রামে।”
ইংরেজ ভক্তির মোহ দ্রুত ছুটে গিয়ে দেশপ্রেমের প্রথম জাগরণ ধারালোভাবে প্রকাশ পেলো মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায়– ”হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন/তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি/ পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ” বা “রেখো মা দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে।”
১৮৪১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাতৃভাষা বাংলাতে সর্বপ্রথম রচনা করেন ছোটদের পড়বার মতো বই-বর্ণপরিচয়, কথামালা, বোধোদয়, বেতালপঞ্চবিংশতি। বাংলার ছেলেমেয়েদের সামনে তিনি খুলে দেন এক নতুন পৃথিবীর দরজা। পৃথিবীর সব ধর্মের ভেতরে একটি মৌলিক ঐক্য আছে- রাজা রামমোহনের ১৮২৮ সালের ব্রাক্ষ্মসমাজ। জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন এক জীবন্ত ইতিহাস।
“১৮৭৬ এর ১২ সেপ্টেম্বর চূচুরায় বসে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেন আনন্দমঠ।ওতে “বন্দেমাতরম” গানটির দেখা মেলে। ১৮৯৬ কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ নিজে সুর দিয়ে তা গান। জাতীয়তার ভাবোদ্দীপক ধ্বনি বন্দেমাতরম সর্বজন পরিচিতিলাভ করে। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ওই ধ্বনি উচ্চারণ করে মৃত্যুবরণ করেন। তিলকের কংগ্রেস জাতীয় সঙ্গীতরূপেও গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন হয়ে নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “জনগণমন” গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতরূপে গ্রহণ করে। যাতে বঙ্গদেশের কথাও রয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ যে বঙ্গকে বুকে ধারণ করতেন, সেই বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ ঘটে ১৯৪৭-এ।
১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের নামে অঙ্গচ্ছেদ হলে রবীন্দ্রনাথ “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”  রচনা করেন। এতে হলো স্বদেশী আন্দোলন তীব্রতর। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় “বঙ্গভবন” নামে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ স্থাপনও করেন। কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গকে “বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ” বলেছিলো। ১৯১১ আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ করে। বাংলা এক হয়। কংগ্রেস ১৯৪৭ সালে বাংলাকে পূর্বে-পশ্চিমে দুটুকরো করে যখন ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। সাত বছর আগে মহাপ্রয়াণ ঘটে তাঁর।
কায়েদে আজমের পাকিস্তানে পূর্ববাংলা টিকে ২৩ বছর। একসাগর রক্তের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় কবিগুরুর সেই ‘আমার সোনারবাংলা’ই আমাদের  জাতীয় সঙ্গীত।
২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। পরাধীন পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে দিবসটির কদর। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় আসীন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…”
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
Alert! This website content is protected!